You are currently viewing অবৈধ পথে বিদেশ গিয়ে অনেকের স্বপ্নের সমাধি হচ্ছে  

অবৈধ পথে বিদেশ গিয়ে অনেকের স্বপ্নের সমাধি হচ্ছে  

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কেবল সনদনির্ভর হয়ে পড়ায় এবং কারিগরি দক্ষতার অভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ তার যোগ্য স্থান করে নিতে পারছে না। একইসঙ্গে লিবিয়া হয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে প্রাণহানি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নারী গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বর্তমানে এক চরম জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সিলেট প্রেসক্লাবের আমিনুর রশিদ চৌধুরী মিলনায়তনে গ্রেটার সিলেট ডেভেলাপমেন্ট এন্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল (জিএসসি)  ইন ইউকে আয়োজিত ‘অবৈধ ঝুঁকিপথে বিদেশ যাত্রার পরিবর্তে বৈধপথে ইউরোপ গমনের উপায়’ শীর্ষক সেমিনার ও মতবিনিময় সভায় প্রবাসী কমিউনিট নেতা, ব্যবসায়ী নেতা ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এসব মন্তব্য করেন।
সেমিনারের কি-নোট পেপার(মূল প্রবন্ধে) উপস্থাপনকালে জিএসসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আতাউর রহমান বলেন, বিলেতসহ বিভিন্ন দেশে বৈধ পথে গিয়ে অনেকে অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। অনেকের জীবনের স্বপ্নের সমাধি হচ্ছে। কন্টাক্ট ম্যারিজ, বডি পাস, কেয়ার ভিসা এমনকি স্টুডেন্ট ভিসায়ও অনেকে সেখানে গিয়ে বিপদে পড়ছে। সেখানে অনেকে আবার ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সও করছে। দেশে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীদের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন কোর্সের জন্য বিদেশ যাবার পরামর্শ তার। পাশাপাশি এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টিরও তাগিদ দেন।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী লন্ডনের শ্রমবাজারের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনে প্রচুর শূন্যপদ তৈরি হলেও ইংরেজি ভাষার দক্ষতা ও নির্দিষ্ট কারিগরি জ্ঞান না থাকায় আমরা সেই সুযোগ নিতে পারিনি। জিএসসি একটি প্রেশার গ্রুপ হিসেবে সরকারকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।’
জিএসসির বর্তমান চেয়ার সালেহ আহমদ তারা দীর্ঘদিন ধরে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু, এ দাবি আজো উপেক্ষিত্ সিলেট-ম্যানচেষ্টার-সিলেট ফ্লাইট ফের চালু হওয়ায় তিনি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দুর্ভোগ এড়াতে তিনি সংশ্লিষ্টদের বৈধ পথে বিদেশ যাবার পরামর্শ দেন।
সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় সভায় সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি মুকতাবিস উন নূর মধ্যপ্রাচ্যে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর বিষয়টিকে ‘জাতীয় লজ্জা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাজার হাজার নারী সেখানে যৌন হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সরকার সব জেনেও কেন তাদের সেখানে পাঠাচ্ছে তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। নারীদের দেশের বাইরে না পাঠিয়ে দেশের ভেতরেই সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশ যেতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী। তিনি বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের অভাব এবং দালালের খপ্পরে পড়ে যুবসমাজ মৃত্যুকূপে ঝাঁপ দিচ্ছে। দালালদের কঠোর আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
জিএসসি সিলেট  চ্যাপ্টারের সভাপতি শিক্ষাবিদ প্রফেসর কবির দক্ষ জনশক্তি তৈরীর মাধ্যমে বিদেশে মানুষ পাঠানোর প্রতি গুরুত্বারুপ করেন। এজন্য সরকারের পাশাপাশি প্রবাসী বিনিয়োগও আহ্বান করেন তিনি।
আলোচনায় অধ্যাপক ফরিদ আহমদ বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত সনদনির্ভর। কারিগরি প্রতিষ্ঠানে প্রবাসী বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
ধন্যবাদ বক্তব্যে সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ সিলেটের সুনামগঞ্জ, দিরাই ও শাল্লা অঞ্চলের মানুষের অবৈধ পথে লিবিয়া যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে কথা বলেন। তিনি পরামর্শ দেন, ‘আত্মীয়-স্বজনদের বিদেশ পাঠানোর জন্য বড় অংকের টাকা দালালের হাতে না দিয়ে, সেই অর্থ জিএসসির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিতে ব্যয় করলে নিরাপদ ও দক্ষ অভিবাসন নিশ্চিত হবে।’
বক্তারা মনে করেন, সিলেটে অনেক যুবক দেশে কাজ করতে লজ্জা পেলেও বিদেশে গিয়ে সাধারণ কাজ করতে দ্বিধা করেন না। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এছাড়া সিলেটে নিবন্ধনহীন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর প্রতারণা রুখতে প্রশাসন ও সংবাদকর্মীদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
আলোচকদের মতে, স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরেও অন্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজস্ব দক্ষ জনবল গড়ে তোলাই হবে একমাত্র সমাধান। নার্সিং, ইলেকট্রনিক্স এবং আধুনিক কারিগরি শিক্ষায় ৬ মাস বা ১ বছরের কোর্স চালু করে বিশ্ববাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারলে তবেই রেমিট্যান্স প্রবাহ টেকসই হবে এবং অবৈধ অভিবাসনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে।
সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি বদরুদ্দোজা বদর, পাসপোর্ট অ্যাটাসটেশনের ক্ষেত্রে লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাসের হয়রানির বিষয়ে জিএসসির সহযোগিতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে সিলেট প্রেসক্লাবের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, ব্যাংক কর্মকর্তা, জিএসসির সিলেট চ্যাপ্টারের নেতৃবৃন্দসহ সুধীজনের উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply