একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়ে তোলার অন্যতম শর্ত কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। দ্রুত নগরায়ণের এ সময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কয়েকবছর আগেও সিলেট নগরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ছিল নাজুক অবস্থা। তবে গত দুই বছরে এ খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মতান্ত্রিক তদারকি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগের ফলে নগরীর পরিচ্ছন্নতায় এসেছে নতুন মাত্রা। যার প্রমাণ পাওয়া যায় এবারের ঈদুল আজহার দিন। যেখানে ঈদের দিন সারাদেশে সিটি করপোরেশনগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খেয়েছে সেখানে বেলা২টার ভিতরে মুল সড়কের সকল কোরবানির বর্জ্য পরিষ্কার হয়ে গেছে।একসময় নগরীর ছড়া ও ড্রেন পরিষ্কারে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পাওয়া গেলেও বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নগরবাসীর আচরণেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। ফলে সিলেট নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিগত দুই বছরে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং নিয়মতান্ত্রিক তদারকির মাধ্যমে সিসিকের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের এই পরিবর্তন এসেছে। ওয়ার্ডভিত্তিক সুপারভাইজার নিয়োগ, গুগল ক্যামেরা এপ এর মাধ্যমে শ্রমিকদের কাজের তদারকি, কর্মীদের উৎসাহ দিতে পুরস্কার প্রদান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক প্রচারণা, লিফলেট বিতরণ এবং ছাত্র-তরুণদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কর্মসূচি—এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন ধারা সৃষ্টি করেছেন।আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য—“প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য”। এই বিশেষ দিনে পরিবেশবান্ধব সিলেট গঠনের এ প্রয়াস, এর চ্যালেঞ্জ, সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ একলিম আবদীন।সেনাবাহিনীর কর্মজীবন শেষে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তার অভিজ্ঞতা, ভাবনা এবং সিলেটকে আরও পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন সিলেট টুডেকে।মোহাম্মদ একলিম আবদীন সিলেট টুডেকে বলেন, সিসিকে আসার পর যে পরিবর্তন হয়েছে এর পুরো কৃতিত্ব আমার বিভাগের শ্রমিক, ড্রাইভার ও সুপারভাইজারদের। আমি শুধু নির্দেশনা দিয়েছি মাত্র। আমি আসার আগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাজ কর্মে জবাবদিহিতা ও নিয়ম শৃঙ্খলার অভাব ছিল। প্রথমেই তিনি ওয়ার্ড ভিত্তিক সুপারভাইজার নিয়োগ দিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসেন। একই ভাবে কেন্দ্রিয় ভাবে নিয়োজিত শ্রমিকদের সুপারভাইজারদের অধীনে আজ করানো শুরু করেন এবং সুপারভাইজারদের জবাবদিহিতার অধীনে নিয়ে আসেন। নিয়মিত ভাবে প্রতি সপ্তাহে সুপারভাইজারদের নিয়ে সভা করা হয়। এলাকা ভাগ করে নির্দিষ্ট রুট পরিকল্পনা করে কাজ করানো শুরু হয়। কাজের সুবিধার্থে কিছু সুপারভাইজেরদের মনিটরিং এর দায়িত্ত দেয়া হয়।তিনি বলেন, কাজ করতে গিয়ে দেখলাম সিটি করপোরেশনে কতটুকু ময়লা হয়, কতটি ভ্যান আছে এ সংক্রান্ত সঠিক কোনো তথ্য নেই। সিসিকে কখনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য তথ্যগত কোনো স্টাডি করানো হয়নি। তাই আমি একটি এনজিওর (এসএনভি) মাধ্যমে আমরা জরিপ করালাম। এরপর সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় জরিপ করে জানতে পারলাম কতটুকু ময়লা উৎপাদন হয়। প্রত্যেক ঘরে কতটুকু ময়লা হয়। ভ্যান কয়টি আছে।তিনি বলেন, আমি মনে করি কোনো কাজে সফলতা আসতে হলে জবাবদিহিতা প্রয়োজন। তাই আমি কাজের তদারকির জন্য প্রযুক্তির সহায়তা নেই। কাজের প্রমান হিসেবে গুগল ক্যামেরা আপ ব্যবহার শুরু করি। এর ফলে কখন কে কোথায় কাজ করে তার প্রমান থেকে যায়। এর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলি। কাজ শেষে গুগল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে সুপারভাইজারদের গ্রুপে দেওয়ার নির্দেশনা দেই। এবং এই সিস্টেমটা চালু করার পর অটোমেটিক সবার কাজের জবাবদিহিতা চলে আসে এবং কাজের গতি বাড়ে। এরপর যখন তাদের কাজের অগ্রগতি শুরু হলো তখন আমি তাদেরকে পুরস্কার বা উৎসাহ দিতে শুরু করলাম। সুপারভাইজার শ্রমিক যারাই ভাল কাজ করছে তাদের সবার সামনে এনে প্রশংসা করা ও ছোটখাটো পুরস্কার দেই। এবং আরেকটা যেটা বড় বিষয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত শ্রমিকদের আগে কখনো ডাক্তারি সহায়তা দেওয়া হতো না। কিন্তু আমি শ্রমিকদের ডাক্তারি সহায়তা দেওয়া শুরু করলাম। শ্রমিকদের পোশাক সংকট ছিল। সেটারও সমাধান দিলাম। আমি শ্রমিকদের সাথে নিয়মিত কথা বলি তাদের সমস্যা নিয়ে। হয়ত আমার এইসব ছোট ছোট কাজ গুলোই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নেকাজে লেগেছে বলে আমার মনে হয়।একলিম আবদীন বলেন, আমি শতভাগ কাজ করেছি বলতে পারবো না। তবে আমি সিসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে কিছুটা নিয়মের মধ্যে আনতে পেরেছি। আগে প্রতিদিন ২৪৫ টন ময়লা কালেকশন চেইনে আসতো, এখন প্রায় ৩০০ টন ময়লা আমরা পরিবহন করি। এর দুটি কারণ আছে। এর একটি হচ্ছে জনগণকে আমরা বেশি সচেতন করতে পেরেছি তাই তারা এখন যত্রতত্র ময়লা না ফেলে ভ্যানে ময়লা দিচ্ছেন। আর আরেকটি হল ভ্যান গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি। আমাদের কাজের কিছু ছবি বা রিলস আমরা ফেসবুক পেইজ পোস্ট দিয়ে মানুষকে কিছুটা হলেও সচেতন করছি, এছারাও লিফলেট বিতরণ, নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ছাত্র বা তরুণ সমাবেশের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মকেও উদ্ভুদ্ধ করার চেষ্টা করছি।তিনি জানান, গত বছর আমরা ছড়া ও ড্রেন পরিষ্কার করার সময় যে পরিমাণ ময়লা পেয়েছি এ বছর সে পরিমাণ পাইনি। কারণ মানুষজন এখন ছড়া ও ড্রেন ময়লা কম ফেলেন, এই প্রশংসার দাবীদার জনগণ। তাই পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়তে সিলেট সিটি করপোরেশনের জনগণের বড় সহায়তা আছে বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি সিসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অক্লান্ত পরিশ্রমতো আছেই।একলিম আবদীন বলেন, আমি এই কাজটা করে মজা পাচ্ছি। কারণ আমি নতুন কিছু করতে পারছিলাম। আমি সিলেটী হিসেবে দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সিলেট সিটির জন্য কিছু করতে চেয়েছি। সিসিক কর্তৃপক্ষ সবসময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আমাদের পাশে ছিলেন। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ।
বর্তমান প্রশাসক সিসিক এর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে আরো উন্নত করতে চান, এইটা আমার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ভাল কাজ করতে গেলে অনেক বাঁধা আসে তার ব্যতিক্রম আমিও নয়
